গাভীর দুধ উৎপাদন বৃদ্ধির ১০টি কৌশল

1
11142

প্রিয় খামারী ভাই-বোনেরা, যারা ডেইরী খামার করেন তাদের প্রায় সবাই চান খামার থেকে বেশি লাভ করতে।আর লাভ করতে হলেই তো বেশি দুধ প্রয়োজন।তাই আপনার খামারের গাভীটি যাতে তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে আপনার আশা পূর্ন করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।গাভী কিন্তু চাই তার সব টুকু উজার করে দিয়ে মালিকের উপকার করার জন্য।কিন্তু সেই সুযোগ আপনি কতটুকু কাজে লাগাতে পারলেন,সেই কারিশ্মা কিন্তু আপনার হাতে।এখন প্রশ্ন হল কি সেই কারিশমা।ব্যাপার জঠিল কিছু নয়।আপনার শুধু জানতে হবে,কেন বা কি কারনে গাভীর দুধ বাড়ে আর কি কারনে কমে! যদি জেনে থাকেন তাহলে মিলিয়ে নিন আর জানা না থাকলে নিমিষেই নিচের ১০ট বিষয় খেয়াল করুন।

১।কিভাবে দুধ দোহন করান?

দুধ উৎপাদন কম হবে না বেশি হবে অথবা ঘন হবে না পাতলা হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করে দোহনের উপর।যদি দহনের কোন ত্রুটি থাকে,দোহন কারী পরিবর্তন হয় তাহলে দুধের পরিমানও পরিবর্তন হবে।আর দুধ হোহনের সময় যদি ইভটিচিং করেন তাহলে তো সে বেকে বসবেই।তার মানে দুধ দহনের সময় তাকে একটি শান্ত-শিষ্ট পরিবেশ দিতে হবে।

তাছাড়া ওলানে দুধের চাপের উপরও দুধের পরিমান এবং  দুধের উপাদানের পরিমান নির্ভর কিরকম? বিষয়টি হল দোহন প্রক্রিয়া অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে দুধে চর্বির পরিমান বাড়তে থাকে।অনেক্ষন পর দুধ দোহন করলে দুধের চাপ বেশি থাকে তাই চর্বির পরমান কম থাকে,কিন্তু যদি অল্প সময় পর পর দোহন করা হয় তবে দুধে চর্বির পরমান বেশি পাওয়া যায়।।তাই একই গাভীর  সকালের দুধের চেয়ে বিকেলের দুধে চর্বির পরিমান বেশি থাকে।

এমন যদি হয় আজকে এই ঘরে তো কালকে অন্য ঘরে দুধ দহন করালেন,অথবা দূধ দহনের সময় পরবর্তন করলেন তাহলেও দুধের পরিমান হ্রাস পেতে পারে।দুধ দোহনের সময় যদি কোন আগন্তুক দাড়িয়েঁ থাকে তাহলে দুগ্ধবতী গাভীটি লজ্জা পাবে এটাই তো স্বাভাবিক।তাই দুধ দোহনের সমইয় “নো বাইরের মানুষ” (এমন কি যদি সে মালিকও হয়!)

২। সুষম খাবার পর্যাপ্ত দিচ্ছেন তো?

যেই গরু বেশীই দুধ দিবে সেই গরুকে বেশি খাবার দিতে হবে এটাই স্বাভাবিক।জানেন সকলে মানেন কয়জনে?১০০ কেজি একটি গরুর কতটুকু খাবার প্রয়োজন সেই বিষয়ে আমার আগের একটি লেখা আছে প্রয়োজন করলে এই লিংকে ক্লিক করে পড়ে নিতে পারেন।এই স্বাভাবিক খাদ্যের সাথে বাড়তি দুধের জন্য বাড়তি খাবার যোগ করতে হবে।আর গরু যদি গর্ভবতী হয় তাহলে আরো অতিরিক্ত যোগ হবে সব ঠিক ঠাক থাকলে তবেই সে আপনাকে ভাল দুধ দিতে পারবে।

০৩।গর্ববতী গাভীর শারীরিক অবস্থা কেমন?

গাভী যদি গর্ভবতী হয় তাহলে তাকে এমন ভাবে খাবার দিতে হবে যেন সে নিজের শরীর চালানো,দুধ উৎপাদন এবং গর্ভস্থ বাচ্চার বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত খাবার পাই।যদি গাভী থেকে ভাল দুধ পেতে চান তাহলে গর্ভস্থ গাভীকে পর্যাপ্ত সুষম খাদ্য এবং সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করতে হবে।তা না হলে দুধ পাবেন ঠিকই কিন্তু খামারে লাল বাতি(!) জ্বলতে বেশী সময় লাগবে না।

খেয়াল রাখবেন,প্রসবের ৫০-৬০ দিন পূর্বেই গাভীর দুধ দোহন অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।কিন্তু তা একদিনে নয়।

০৪।গাভীর বয়স কেমন হল?

বয়সে সাথে সাথে যৌবনে ভাঁটা পড়ে দুধেও টান পড়ে।একটু সহজ করে বলি,প্রথম বিয়ানে দুধের পরিমান একটু কম থাকে দ্বিতীয় বিয়ানে তা আর একটু বাড়ে।তৃতীয় বিয়ানে তা চরমে পৌঁছে যাই।খামারীর আনন্দ ধরে না।সেই রকমই চলে আরো দুই এক বিয়ান তার পরে শুরু হয় ভাঁটার টান।যত বিয়ান বাড়ে তত দুধ কমে।এই হল সাধারনহিসাব নিকাশ।

যদি বয়স হিসাব করেন তাহলে সাধারনত ৪-৫ বছর বয়সে দুধের ভরা বর্ষা চলতে থাকে।আর ৮-৯ বছরের পর শুরু হয় গ্রীষ্মের খরা।এবার ভাবুন,আপনার কি করা?

০৫। শারীরিক ওজনঃ

গরুর আকার এবং ওজনের সাথে রয়েছে দুধের একটি দারুন সম্পর্ক।সেই বিষয়টি আমাও চেয়ে আপনারা আরো ভাল জানেন।গরুর ওজন যত বেশী হয় স্বাভাবিক ভাবে তার ওলান ও পরিপাকতন্ত্র বড় হয়।তাই দুধ উৎপাদন ক্ষমতা ও বেশী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

০৬।গর্ভকালঃ

গর্ভকালে শুরুর দিকে দুধের উৎপাদন তেমন পরিবর্তন না হলেও শেষের দিকে  উৎপাদন হ্রাস পায়।সাধারনত গর্ভস্থ বাচুরের জন্য পুষ্টির প্রয়োজন হয় বলেই দুধ কমে যায় বলে ধারনা করা হয়।তাচাহড়া এই সময় শরীরের মধ্যে ইষ্ট্রজেন এবং প্রজেষ্টেরন(Estrogen & Progesteron) নামক দুটি হরমোন বৃদ্ধি পায়,যা দুধ উৎপাদন হ্রাসে প্রভাব বিস্তার করে।

তাই এই বিষয়ে মন খারাপ করার কিছু নেই।পুরাতন খামারীরা এই বিষয়টি ভালই বুঝেন।

০৭।কতদিন পর পর বাচ্চা হয়?

একবার বাচ্চা দেওয়ার দুই বছর পর যদি ডাকে আসে, তাহলে দুধের কথা তো পড়ে খামার টিকানোই মুশকিল হয়ে যাবে।তাই খেয়াল রাখতে হবে বাচ্চা দেওয়ার ২-৩ মাসের মধ্যের যেন গাভী ডাকে আসে।তাহলে আপনি ১-১.৫ বছরের মধ্যেই  নতুন বাচ্চা পাবেন।তবে কোন ভাবেই বাচ্চা প্রসবের ৬০ দিনের মধ্যে গাভীকে নতুন ভাবে গর্ভবতী করা যাবে।

এতেই করেই আপনার খামের দুধ উৎপাদন ও খামারের লাভ দুটো ঠিক থাকবে।

০৮।সব বাটে কি দুধ সমান আসে?

উত্তর হল না।তাহলে কোন বাট থেকে বেশি আসে?

সাধারনত গাভীর পিছনের অংশের বাট দুটি থেকে মোট দুধের ৬০% আসে এবং সম্মুখ অংশের বাট থেকে বাকি ৪০% আসে।খেয়া রাখতে হবে সব দুধ সঠিক ভাবে আহরপন করেছেন তো!খেয়াল করতে হবে যেন বাটে যেন সমস্যা না আসে।(বাটের সমস্যা প্রতিরোধের উপায়)

০৯। কয়বার দুধ দোহন করেন?

সাধারনত সবাই দুই বেলা দোহন করেন।কিন্তু তা কখন?কখনো সকাল ৭টা বাজে শুরু কখনো ৮টা আবার মাঝে মধ্যে ৮.৩০ টাও হতে পারে।যদি তাই হয় তাহলে বলল আপনার সময়ের ব্যাপারে আরো একটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।চেষ্টা করবেন প্রতিদিন একই সময়ে দুধ দহনের।আর দুই বেলা দুধ দোহনের ব্যবধান যদি হয় সমান সমান (অর্থাৎ ১২ ঘন্টা পর পর) তবে আপনি সর্বাধিক দুধ সংগ্রহ করতে পারবেন।

যদি সম্ভব হয় আপনি তিন বেলাও দুধ দোহন করতে পারেন।এতে করে দুধের পরিমান বড়বে ।তবে দুধ দোহনের ব্যবধান টা সঠিক হওয়া চাই।

১০।গাভীকে কতটুকু পানি দেন?

দুধের প্রায় ৮৭% পানি।তাহলে বুঝুন দুধের মাধ্যমে শরীর থেকে কি পরিমান পানি বের  হয়ে যায়!তাছাড়া একবার প্রস্রাবে করার সময় কতটুকু তরল শরীর থেকে গাভী বের করে খেয়াল করেছেন?তাছাড়া তার শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্যও পানির প্রয়োজন।

কিন্তু কতটুকু বিশুদ্ধ পানি আমরা তাকে দিচ্ছি?স্বাভাবিক ভাবে একটা গাভীর ওজনের উপর ভিত্তি করে ৫০-৮০ লিটার পানি দৈনিক প্রয়োজন হতে পারে। তাই এ ব্যাপারে কোন ধরনের কার্পন্য করা যাবে।গাভীকে তার চাহিদা মাফিক পর্যাপ্ত পানি দিন।প্রয়োজনে একটু বেশি দিন তবে তা কোন ভাবেই যেন তার চাহিদার চেয়ে কম না হয়।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here