ভাল জাতের দুধের গাভী চিনবেন কিনবেন কি ভাবে?

0
9456

বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ খামারীই চাই ভাল জাতের গাভী দিয়ে ডেইরী খামার শুরু করতে।তার বিভিন্ন জায়গায় ভাল জাতের গাভী খুঁজে বেড়ায়।কারন বেশির ভাগ উদ্যোগতাই চাই নিজ খামার থেকে ভাল লাভ বের করে আনতে।

কিন্তু এ কাজ করার আগে আপনাকে জানতে হবে।আসলে ভাল দুধের গরু বলতে কি বুঝায়?অনেক বড় ওলান হলেই কি সেটা একটা ভাল জাতের দুধের গাভী হবে? অথবা যে গরুটি একদিনেই অনেক দুধ দেয় সেটাই কি সেরা গাভী? নাকি যেটা পা লম্বা-শম্বা!

এই সব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে গরুটি কি রকম,আপনার খামারে কতটি গরু আছে আর কি পরিবেশে আপনি গরুটি লালন পালন করছেন এই সব বিষয়ের সামগ্রিক ফলাফলের উপর।

কেউ কেউ মনে করে বেশি দুধ দিলেই গাভীটি ভাল আবার কেউ ভাবে বেশি দুধ না দিক, কিন্তু দীর্ঘ দিন গরুটি দুধ দেয় তাহলে এটিই ভাল।আর ভাল দুধের গরুর সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম।

একটি গাভী কেমন হবে তা মুলত দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে।তন্মধ্যে একটি হল গাভীটির পুর্ব পুরুষ কেমন ছিল তার উপর আর অন্যটি হল গাভীটির পারপার্শিক অবস্থার উপর।তাই ভাল গরু চিনতে হলে এই দুইটি বিষয়েও ধারনা থাকা প্রয়োজন।

তাহলে আপনি একটি ভাল গাভী কেনার আগে কি কি বিষয় ভাবতে হবে?

আপনাকে ভাবতে হবে সারা বছর আপনি কোন ধরনের খাবার দিবেন ,আপনি কি ঘরে বেঁধে পালাবেন, নাকি ছেড়ে পালাবেন?আপানার এলাকার আবহাওয়া কি রকম?বর্ষা কালে এবং গ্রীষ্মকালে আপনার খামারের ব্যবস্থা কি?আপনার এলাকায় দুধের বাজার কেমন ? কোন ধরনের দুধের চাহিদ বেশি? পাতলা না কি ঘন? এই বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে।

এই বিষয় গুলো ভাবার পর আপনাকে গরু বাচাই করতে হবে।

গরু বাচাইয়ে আগে অবশ্য গরুর কিছু বৈশিষ্ট্য যাচাই করতে হবে।তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন কিছু বিষয় নীচে আলোচনা করলাম।

১।ওলানের গঠন

ওলানের গঠন  হবে কোমল এবং নমনীয় অনেকটা থলের মত গঠন। ওলান দ্যোদুল্যমান হবে না বরং সাসপেনসরি লিগামেন্ট (এক ধরনের বন্ধনী যা ওলানকে শরীরের সাথে আটকে রাখে) দ্বারা শক্ত ভাবে আটকানো থাকবে যা প্রায় যোনিদ্বারে কাছাকাছি পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে।বড় ওলান মানেই কিন্তু সবসময় ভাল গাভী নয়।অনেক সময় মাঝারি আকারের ওলান হলেও ভাল দুধের গাভী হতে পারে।তবে তার গোড়াটি বিস্তৃত হতে হবে।এই ক্ষেত্র খেয়াল রাখতে হবে যেন তা হাটুর (Hock joint) নীচে ঝুলে না পড়ে।ওলানের বাটগুলো একই আকারের হওয়া একটি ভাল লক্ষন।আর চারটি বাঁটই পরষ্পর থেকে সমান দূরত্বে এবং সমান্তরাল হওয়া চাই।বাটগুলো সোজাঁ ( straight) হয়ে ওলান থেকে নীচের দিকে ঝুলে থাকবে।(ভিডিও)

ভাল দুধের গরুর ওলানের গঠন

২।দুগ্ধ শিরাঃ
দুগ্ধ শিরা মোটা ও স্পষ্ট হবে।তলপেটে নাভির পাশ দিয়ে দুগ্ধ শিরা আঁকাবাঁকাভাবে বিস্তৃত থাকবে।

৩।পায়ের গঠনঃ

ভাল গাভীর জন্য পায়ের গঠন একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়।বেশি লম্ব বা একদম খাটোঁ পায়ের গরু ডেইরী খামারের জন্য উপযুক্ত নয়।পায়ের আকৃতি হওয়া চাই মাঝারি আকৃতি শক্ত সামর্থ্য। কারন গাভীর জীবনের অনেকটুকু সময় গর্ভবতী অবস্থায় কাটায়।তাই পাগুলো এমন হওয়া চাই যাতে দুধ দান কালীন সময়ে গর্ভবতী হলেও যাতে শক্ত পায়ে চলা ফেরা করতে পারে।পায়ের গঠন  মোটা সোটা এবং শক্ত হলে এই গাভী বছরের পর বছর দুধ দিবে অর্থাৎ বাঁচবে দীর্ঘ দিন।

যদি পিছন থেকে তাকান তাহলে দেখতে হবে পিছনের পাগুলো যেন সোজা করে দাঁড়িয়ে আছে কিনা?যদি তাই হয় তাহলে খেয়াল করুন পিছনের দুই পায়ের মাঝখানে প্রশস্ত আছে কিনা।

এবার পাশে থেকে তাকান, তাহলে দেখতে হবে হাটুর ভাঁজটি সামান্য পিছনের দিকে আছে কিনা (sickle hock)অর্থাৎ হাঁটুর পিছনে সামান্য কোনাকৃতি হয়ে থাকবে (>) ।

সামনের পাগুলোও খাড়া থাকবে এবং খুঁড়ের উপরে জোড়াটি (Pastern joint) সুঠাম হবে। আর এই দুই পায়ের মাঝখানটা পর্যাপ্ত প্রশস্ত হবে। পিছনের নিতম্বের হাড়গুলো (Pin bones) প্রসারিত হবে। (ভিডিও )

৪।দৈহিক আকৃতিঃ
ভাল গাভীর দেহ সাধারন সামনের দিকে হালকা এবন পিছনে দিকে ভারী  ও সুগঠিত
ভাল গাভীর দেহের আকৃতিটা হয় অনেক ত্রিকোনাকার অর্থাৎ সামনের দিকে একটু সরু এবং সামনে থেকে পিছনের দিকে তা ক্রমান্বয়ে প্রশস্ত।গাভীর ঘাড়টা লম্ব হওয়া চাই।থুতনি হবে বড় আর পিঠের মেরুদন্ড হবে সোঁজা।
গাভীর চামড়া হবে পাতলা ডিলে-ঢালা।চামড়ার নীচ্ব অহেতুক চর্বি জমবে না।তবে চামড়ার রং উজ্জ্বল হতে পারে।

৫।পাঁজরঃ
হয়।গাভীর বুকের পাঁজর হবে প্রসারিত যতে করে শরীর অভ্যন্তরীন বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলো সঠিক পরিমান জায়গা পায়।তাছাড়া গর্ভবতীকালীন যাতে বারতি চাপ সালাতে পারে এ জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা প্রয়োজন।

৬।প্রজনন ক্ষমতাঃ
গাভীকে গর্ভবতী করার জন্য কয়বার প্রজনন করানো হচ্ছে তার উপর আপনার খামারের সফলতা ব্যর্থতা অনেকাংশে নির্ভর করে।যে গাভীকে যত কম কৃত্রিম প্রজনন করিয়ে গর্ভবতী করা যায় সেই গাভীর প্রজনন ক্ষমতা তত ভাল।তাই ভাল প্রজনন ক্ষমতা সম্পন্ন (Conception Rate) গাভীকেই খামারের জন্য নির্বাচন করতে হবে।যেই গরুর প্রজননে সমস্য আসে অথবা বার বার প্রজনন ( Repeat Brereding) করে গর্ভবতী করাতে হয় সেই গাভী খামারে রাখা ব্যয়বহুল এবং খামারের জন্য অলাভজনক।
খামারীকে লক্ষ্য রাখতে হবে প্রতি বছর প্রতি গরু থেকে যে একটি বাচুর (One calf per cow per year) পাওয়া যায়।সেটা সর্বোচ্চ ১৪ মাস পর্যন্ত সহ্য করা যায় তবে তার বেশি নয়।

৭।গড় আয়ুষ্কালঃ
গাভী তার জীবন দশায় কতটী বাচ্চা দেয় আর কতটূকু দুধ দেয় সেই বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ন।যদি শারীরিক অবস্থা ,প্রজনন ক্ষমতা শ বিভন্ন বিষয়ের সাথে এটি সম্পৃক্ত।তার পরেও খেয়াল রাখতে হবে সেই গরুটি আপনি নিচ্ছেন তার মা-দাদীর দুধের ইতিহাস কেমন অথবা যে বীজটি দিয়ে আপনার খামারে গাভীটিকে প্রজনন করাচ্ছেন তাই পূর্ব পূরুষের দুধ উৎপাদন ক্ষমতা কেমন?তা ছাড়া তারা জীবদ্দশায় কয়টই বাচ্চা দিয়েছে বিষয়টি জানতে পারলে তো আর কথাই নেই। এই জন্য প্রত্যেক খামারীর উচিত রেকর্ড সংরক্ষন করা।
৮।জাত নির্বাচনঃ
যেই গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং যেই গরুর রোগ হলে সহজে সুস্থ করে তোলা যায় সে সমস্ত গরু নির্বাচন করতে হবে।এখন জনার হল সেই জাতটাকোন জাত।

আমাদের দেশের আবহাওয়া থাকে অস্থির অর্থ বছরে বিভিন্ন সময় প্রকৃতি বিভিন্ন রুপ ধারন করে।তাই রোগ বালাই বেশি হয়।এই অবস্থা কোন খাঁটি জাত (pure breed) খামারের জন্য সুখকর হবে না।আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত হল সংকর জানতে গরু।যেই গরুগুলো উন্নত জাতের গরুর সাথে দেশি জাতের গরু সংকরায়নের ফলে পাওয়া যায়।

৯।বাচ্চা ধারন ক্ষমতাঃ
গর্ভবতী অবস্থায় বাচ্চাকে সঠিক ভাবে ধারন করার জন্য জরায়ুর পার্শবর্তী হাড়গুলো গঠন সঠিক হওয়া জরুরী।
যদি পিছন থেকে তাকান তাহলে খেয়াল করতে হবে যে হাড়ের কোটরীর(Pelvic gurdle) মধ্যে বাচ্চা বড় হয় সেটি পর্যাপ্ত প্রশস্ত আছে কিনা?পাশ থেকে তাকালে দেখতে পাবেন।লেকের গোড়া( Hip bone) থেকে নিতম্বের উঁচু অংশের(pin bone) দিকে ক্রমশ ঢালু হয়ে গেছে।

তলপেটের অংশটি হবে সোজা এবং সুঠাম যা গর্ভবতী অবস্থায় গাভীটিকে সঠিক ভাবে খেতে এবং বাচ্চা ধাড়োণ করতে সহায়তা করবে।

১০।দুধ নিঃসরন ক্ষমতাঃ

দুধ দোহনের সময় গাভী কত দ্রুত দুধ ছাড়ছে তার উপর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে।কারন দুধ নিঃসরন নিয়ন্ত্রন করে অক্সিটোসিন নামের একটি হরমোন যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রক্তে থাকে ।ঐ নির্দিষ্ট সময় পরে ওলানে দুধ থাকলে ঐ দুধ আর সঠিক ভাবে দোহন করা যায় না। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপনাকে দুধ দোহন সম্পন্ন করতে হবে।

এই কাজটি করার জন্য বাঁটের আকার,আকৃতি এবং ছিদ্র সঠিক হওয়া চাই হওয়া চাই সঠিক।আর গরু যদি হয় বেশী রাগী অস্থির হয় তাহলে ঐ অক্সিটোসিন হরমোন এর প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি হয়।আই খামারের জন্য শান্ত শিষ্ট গরুই খামারের জন্য নির্বাচন করতের হবে।

ধর্য্য ধরে যখন একটুকু পড়েছেন তাহলে আশা করি ধর্য্য ধরে একটি ভাল জাতের গাভীই আপনার খামারে জন্য সংগ্রহ করতে পারবেন।

(ডেইরী খামারের বিভিন্ন বিষয় বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন)

ধন্যবাদ সাথে থাকুন

Farmer Hope

Reference :

1.www.nation.co.ke
2.দুগ্ধ খামার হ্যাণ্ডবুক,প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
3. Internet
4.Others

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here