গরুর দুধে ভাইরাস মোকাবিলা—কিভাবে?

0
1384

যুগ যুগ ধরে মানুষ আদর্শ খাদ্য হিসেবে দুধ গ্রহন করেছে।যার মাধ্যমে নিজের অজান্তে বা সজ্ঞানেই মানুষ নিজের মধ্যে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী দূর্গ।কারন দুধের মধ্যে এমন কিছু উপাদান আছে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা  সুদৃঢ় করে।

দুগ্ধ প্রোটিন ক্যাসিন

দুধের এরকম একটি উপাদান হল কেসিন। এটি হল দুধের মূল প্রোটিন অংশ।এই কেসিন প্রোটিন এবং তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ বা পলি পেপটাইটগুলোও ভাইরাস বিরোধী কাজ করে।এরা শরীরের রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে মুলত দুই উপায়ে।তার মধ্যে একটি হল শরীরের ভিতরে বহিরাগত ভাইরাসকে মেরে ফেলার যে প্রক্রিয়া চলে তাকে ত্বরান্বিত করে।আর একটি হল এই ক্ষেত্রে শরীরের মারাত্মক আত্মঘাতী কিছু কার্যক্রম (যেমনঃপচন বা Sepsis)) কে সে কমিয়ে আনে বা প্রশমিত করে।তাছাড়া শরীরের ভিতরে যে বি-লিম্পোসাইট এবং টি-লিম্পোসাইট গুলো থাকে তাদেরকে সচল করে দেয় এবং সচলগুলোর কার্যকারিতে বৃদ্ধি করে দেয়। দুধের আরেকটি প্রোটিন হল ল্যাক্টোফেরন যা সরাসরি ভাইরাসের উপর কাজ করে।

ল্যাকটো এল্বুমিন এর প্রভাব

আলফা ল্যাকটো অ্যালবুমিন (α Lacto albumin) নামের দুগ্ধ প্রোটিনটিও ভাইরাস বিরোধি কার্যক্রমের সাথে জড়িত সাথে সাথে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে।গবেষনায় দেখা গেছে লেকটোফেরন এবং এর থেকে উৎপন্ন পেপটাইটগুলো মুলত ভাইরাস তার পোষক দেহের কোষের সাথে যেখানে ক্রিয়া বিক্রিয়া করে সেখানেই হস্তক্ষেপ করে।পোষক কোষের (Host cell) প্রাচীরে যে ঋনাত্মক চার্জধর্মী হেপারেন সালফেট (heparin Suhate) থাকে তার সাথে মিথস্ক্রিয়া করে ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক অবস্থা তৈরি করে।ফলে ভাইরাস আর পোষকের কোষের অভ্যন্তর প্রবেশ করতে পারে না।

অন্যদিকে বিটা –ল্যকটোগ্লোবিউওলিন বা  আলফা ল্যাকটোএলবুমিন জাতীয় দুগ্ধ প্রোটিনের বাইরের আবরনীতে ঋনাত্মক ধর্মী অংশ (Anionic patch) থাকে কিন্তু ক্যাসিনের বাইরের দিকে ধনাত্মক এবং ঋনাত্মক ধর্মী অংশ আছে।তাই দুধের এই দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকার কারনে এর ভাইরাস এবং পোষকের দেহের মিথস্কিয়ায় জোড়ালোভাবে বাধা প্রদান করতে পারে।

সাধারনত একটি ভাইরাস তার জীবন চক্রে বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে ।যেমনঃ পোষক কোষের সাথে যুক্ত হওয়া,তারপর উক্ত কোষের মধ্যে ডুকে যায়,ভাইরাসের জিনোমের রেপ্লিকেশন সম্পন্ন হয়,ভাইরাস নিজস্ব প্রোটিন তৈরি করে নিজেদের বংশ বিস্তার করে এবং আক্রান্ত কোষ থেকে বের হয়ে আসে।এই ধাপগুলো যেকোন পর্যায়ে দুগ্ধজাত প্রোটিন বা ভাইরাস রোধী উপাদান কাজ করে।

ভাইরাসের গাঠনিক প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়েঃ

যেই ভাইরাসগুলোর বাইরে কোন আবরনী পর্দা  থাকে না (Non Enveloped) সেগুলোর বাইরের দিকে গাঠনিক প্রোটিনগুলো অনেক সময় কাঁঠা বা আঁশের মত বাইরের দিকে বের হয়ে থাকে যা পোষক কোষের সাথে প্রাথমিকভাবে যুক্র হতে সাহায্য করে।আর সমস্ত ভাইরাসের বাইরে পর্দা থাকে (Enveloped) তারা পোষক কোষের রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হয়।

দুধের এমন কিছু প্রোটিন আছে যা এই দুই ধরনের ভাইরাস প্রোটনের সাথে যুক্ত হয় ভাইরাসকে পোষক কোষের সাথে যুক্ত হতে বাঁধা দেয়।ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের আবরনীতে হিমাগ্লুটিনিন নামে একধরনের প্রোটিন পাওয়া যায় যা ভাইরাসকে পোষক কোষের সাথে যুক্ত হতে এবং ভাইরাসের জিনোম ঐ কোষের ভিতরে প্রবেশ করতে সহায়তা করে।দুধের কিছু প্রোটিন এই হিমাগ্লুটোনিনের সাথে যুক্ত হয়ে হিমাগ্লুটিনেশোনের মাধ্যমে এর কার্যকরিতা ধ্বংস করে দেয় ফলে ঐ ভাইরাস আর পোষক কোষে প্রবেশ করতে পারে না।

ভাইরাসকে পোষক কোষের সাথে সংযুক্ত হতে বাঁধা প্রদানঃ

ভাইরাস পোষক কোষের সাথে যুক্ত হওয়াড় জন্য পোষক কোষের কোন রিসেপ্টরকে সনাক্ত করতে হয় তারপর তার সাথে যুক্ত হয়ে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করে ।কিন্তু যদি ভাইরাস এই রিসেপ্টরকে খুঁজে না পায় তাহলে  সে তার জীবনের পরবর্তী ধাপগুলো অতিক্রক করতে পারে না।দুধের প্রোটিন এই রিসেপ্টর গুলোর সাথে ক্রিয়া করে নিষ্কিয় করে দেয়।যার কারনে ভাইরাস তাকে আর খুঁজে পাই না।

ভাইরাসের বংশ বিস্তারে (replication) বাঁধা প্রদান করাঃ

ভাইরাসের রেপ্লিকেশনের জন্য বিভিন্ন এনজাইম ব উৎসেক প্রয়োজন দুগ্ধজাত বিভিন্ন প্রোটিন এই সমস্ত এনজাইমকে বাধাঁ দিয়ে ভাইরাসের রেপ্লকেশনকে বাধাগ্রস্ত করে ফলে ভাইরাস বংশ বিস্তার করতে পারে না।

পোষক কোষের সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করাঃ

পোষক দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থ দুই ধরনের একটি হল তার সহজাত (innate) যা স্বাভাবিকভাবে তার শরীরে থাকে ।আর অন্যটি হল, যখন বাইরের থেকে শরীরের জন্য ক্ষতিকর কোনকিছু (Foreign Antigen) শরীরে প্রবেশ করে শরীরের অভ্যন্তরে বেশ কিছু প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।যার ফলে বিভিন পদার্থ উৎপন্ন হয়ে উক্ত বিপদ মোকাবেলা করে।এটি হল তার অভিযোজিত(Adoptive)  রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

শরীরে সহজাত রোগ প্রতিরোধের জন্য আছে বিভিন্ন ধরনের লিয়োকোসাইট যেমন ম্যাক্রোফেজ, ডেনড্রাইটিক সেল,কিলার কোষ ইত্যাদি।আবার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন নতুন শত্রু মোকাবিলায় অভিযোজিত হয় তখন মূল ভূমিকা পালন করে বি-লিম্পোসাইট এবং টি-লিম্পোসাইট এর মত কোষ গুলো।আর এই দুইটি পথকে একত্রিত করতে কাজ করে সাইটোকাইন কেমোকাইন নামক বিভিন্ন সংকেত প্রদানকারী পদার্থ।

ল্যাকটোফেরন প্রাকৃতিক কিলার কোষের (Natural Killer Cell) সাইটোটক্সিক ক্ষমতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।সাথে সাথে পলিমরফোনিউক্লিয়ার লিউকোসাইটের গতিশীলতাও বাড়িয়ে দেয় এবং সুপার অক্সাইড উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়।এটি ম্যাক্রোফেজগুলোকে সক্রিয় করে দেয় এবং বিভিন্ন ধরনের সাইটোকাইন উৎপাদনের জন্য উদ্দীপ্ত করে।
অন্যদিকে ল্যাকটোফেরন বিপদকালীন মূহুর্তে লিম্পোসাইটের বৃদ্ধিকে উদ্দীপ্ত করে।যার ফলে অপরিনত বি-লিম্পোসাইট এবন টি-লিম্পোসাইটগুলো গঠনত পরিবর্তন হয়।ফলশ্রুতিতে বি-লিম্পোসাইটগুলো এন্টিজেনকে টি-হেল্পার টাইপ ২ কোষগুলোর সামনে তুলে ধরতে পারে।

তার মানে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় নিয়োজিত কোষগুলোকে সক্রিয় করা থেকে শুরু করে এন্টিজেন বিরোধী যুদ্ধে অংশ গ্রহন করা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে দুগ্ধজাত ল্যাকটোফেরন সযোগিতা করার মাধ্যমে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করে।

দুগ্ধজাত বিভিন্ন পেপ্টাইট কিভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ত্বরান্বিত করে?

ল্যাকটোফেরন ছাড়াও বিভিন দুগ্ধজাত প্রোটিন এবং পেপটাইট ভাইরাস বিরোধী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে।ল্যাকটোফেরন থেকে তৈরি ল্যাকটোরিসিন ও ল্যাক্টোরেফেরাম্পিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে কাজ করে।
কেসিন পেপটাইট অধিক লিম্পোসাইট এর সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য উদ্দীপ্ত করে।সাথে সাথে শরীরে যে ম্যাকরোফেজ আছে তাদের কার্যকারীতে বাড়িয়ে দেয়।তাদের কাজ হলো শরীরের জন্য ক্ষতিকর এন্টিজেনকে খেয়ে ফেলা।

তাহলে বিষয়টি দাঁড়াল, দুধের এমন অনেক প্রোটিন এবং পেপ্টাইট আছে যা ভাইরাস বিরোধী কাজ করে মূলত ভাইরাস রোগ তৈরি জন্য যে যে ধাপের মধ্য দিয়ে যায় সেই সেই ধাপে বাধা প্রদান করে।আবার এদের মধ্যে অনেকে আছে যারা এন্টি ভাইরাল ঔষধের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়।তবে এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত গবেষনা প্রয়োজন।দুধের প্রোটিনও হয়ত হতে পারে কোন এন্টি ভাইরাল ড্রাগের টেমপ্লেট।

এই লেখাটি লেখার সময় আমি বেশ কিছু লেখকের লেখা,সায়েন্টিফিক জার্নাল সর্বোপরি ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়েছি।দুধ যে ভাইরাসের প্রতিরোধে অনেক ভুমিকা রাখতে পারে তার কয়েকটি রেফারেন্স নিচে উল্ল্যেখ করলাম।যা আমার এই লেখার খোরাক জুগিয়েছে।

[বিঃদ্রঃ এই লেখা কোন চিকিৎসা পত্র বা সেই সুম্পর্কিত কোন বিষয় নয়।এটি শুধু মাত্র বিজ্ঞান ভিত্তিক আলোচনা।কেউ অনুসরন করলে তা নিজ দায়িত্ব করতে হবে।তাই এই লেখার কোন প্রভাবের জন্য লেখক দায়ী থাকবে না।

Sources/References:
  1. Kayser, H., and Meisel, H. (1996) Stimulation of human peripheral blood lymphocytes by bioactive peptides derived from bovine milk proteins, FEBS Lett 383, 18-20.
  2. Bellamy, W., Takase, M., Yamauchi, K., Wakabayashi, H., Kawase, K., and Tomita, M.(1992) Identification of the bactericidal domain of lactoferrin, Biochim Biophys Acta 1121,130-136.
  3. Fiat, A. M., Levy-Toledano, S., Caen, J. P., and Jolles, P. (1989) Biologically active peptides of casein and lactotransferrin implicated in platelet function, J Dairy Res 56, 351-355.
  4. Meisel, H. (1997) Biochemical properties of regulatory peptides derived from milk proteins, Biopolymers 43, 119-128.
  5. Haiyan Sun and Håvard Jenssen, Milk Derived Peptides withImmune Stimulating Antiviral Properties (http://dx.doi.org/10.5772/50158)
  6. Internet

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here