বাংলাদেশে দুগ্ধ শিল্পের উন্নয়নে উন্নত জাতের গরুর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

0
289

দুধ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উন্নত জাতের গরুর কোন বিকল্প নেই।ডেইরী শিল্প টিকে থাকার জন্য প্রথম যেটি প্রয়োজন সেটা হল খামারীকে লাভবান হতে হবে।যদি খামার করে খামারী লাভবানই না হয় তা হলে উনি কেন খামার করবেন।কিন্তু খামারে লাভ লস  অনেকাংশ নির্ভর করে খামারে দুধ উৎপাদনের উপর।যদি সঠিক ভাবে দুধই উৎপাদন না হয় তাহলে খামার ঠিকবে কি করে। যদিও এর সাথে আরো অনেক বিষয় জড়িত, যেমনঃ খামার ব্যবস্থাপনা এবং পন্য  বিপনন। তাই ডেইরী সেক্টরের উন্নয়নের জন্য অনেক আগে থেকেই চেষ্টা শূরু হয়।


বাংলাদেশ ভূখণ্ডে কারখানা ভিত্তিক ডেইরি শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৪৬ সালে। পাবনা-সিরাজগঞ্জ জেলায় নামমাত্র মূল্যে দুধ বিক্রয় হতো, সেহেতু দুগ্ধ ব্যবসায়ীরা কোলকাতাকে মার্কেট হিসেবে চিহ্নিত করে ১৯৪৬ সালে তত্কালীন ভারতীয় উপমহাদেশের ন্যাশনাল নিউট্রিয়েন্টস ইনস্টিটিউট কর্তৃক বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার লাহিরমোহনপুরে প্রথম দুগ্ধ কেন্দ্রটি স্থাপন করে। ১৯৪৮ সালে   মুখলেছুর রহমান তার নিজস্ব বিনিময় সূত্রে কারখানাটির মালিকানা গ্রহণ করেন ও নামকরণ করেন ইস্টার্ন মিল্ক প্রোডাক্টস। ১৯৫২ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে দুগ্ধ ও দুগ্ধপণ্যের বিপণন সংস্থা মিল্ক ভিটা ব্র্যান্ড নামে যাত্রা  করে। দুধ, ঘি, মাখন ইত্যাদি দুগ্ধজাত পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করে কলকাতা শহরে স্বল্প পরিসরে কিছু দিন মিল্ক ভিটা নামে বাজারজাতও করা হয়। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি সমবায় ব্যবস্থাপনায় এনে সমবায়ভিত্তিক প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমিতি গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং পুরনো নাম সংশোধন করে প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয় ‘ইস্টার্ন মিল্ক প্রডিউসার্স কো-অপারেটিভ ইউনিয়ন লিমিটেড। কিন্তু প্রাথমিকভাবে সমবায় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ফলপ্রসূ না হওয়ায় ১৯৬৮ সালে সমবায় বিপণন সমিতি কর্তৃক ওই কারখানার দায়িত্বভার গ্রহণ করা হয়। একই সময়ে আর্থিকভাবে দেউলিয়াত্বের কারণে সমবায় বিপণন সমিতি কর্তৃক ঢাকার তেজগাঁওয়ে ‘অষ্টো ডেইরি’ নামে বোতলজাত দুগ্ধ উৎপাদন ও বিপণনের আরেকটি প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্বভার গ্রহণ করা হয়। প্রতিষ্ঠান দুটি সীমিতভাবে কিছুদিন উৎপাদন ও বিপণন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সহযোগিতার অভাবে ১৯৭০ সালের প্রথমদিকে  এগুলোর উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

স্বাধীনতার পরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেহনতি মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন, কৃষকের উৎপাদিত দুধের ন্যায্যমূল্য এবং শহরের ভোক্তাশ্রেণীর মধ্যে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত দুগ্ধ সরবরাহের জন্য নিজস্ব উৎপাদন ক্ষেত্র দিয়ে দুগ্ধ চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে ভারতের ‘আমূল’ পদ্ধতি অনুসরণ করে দুগ্ধশিল্প গড়ে তোলার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। তারই ফলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ডেনিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার পরামর্শে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদক সমবায় লিমিটেড গঠিত হয়। দুগ্ধ উৎপাদনকারী কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারের ১৩ কোটি টাকা ঋণসহায়তায় দেশের পাঁচটি দুগ্ধ এলাকায় কারখানা স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালে ‘বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড’ (মিল্ক ভিটা) নামে এর নামকরণ   হয়। ১৯৯০ দশকের গোড়ার দিকে মিল্ক ভিটা একটি লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। বর্তমানে মিল্ক ভিটার অধীনে বাংলাদেশের তরল দুধের ৭০ শতাংশ বাজার দখলে রয়েছে। মিল্ক ভিটা প্রতিদিন ৪০ হাজার দুগ্ধ উৎপাদনকারী কৃষকের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে। এর অধীনে রয়েছে ৩৯০টি প্রাথমিক কো-অপারেটিভ সোসাইটি। প্রতিদিন সদস্যদের কাছ থেকে গড়ে দু-এক লিটার উদ্বৃত্ত দুধ সংগ্রহ করে। তরল দুধের পাশাপাশি মিল্ক ভিটা ঘি, মাখন, আইস ক্রিম, মিষ্টি দই, মিষ্টিহীন দই, ক্রিম, চকোলেট, বিক্রি করে।

গ্রামীণ চাষীদের জন্য একটি সংগঠিত বাজার তৈরি করতে এবং তাদের  লাভজনক ব্যবসায় সহায়তার জন্য ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ব্র্যাক ডেইরি’ তথা আড়ং। যখন গ্রামগুলোয় দুধের চাহিদা কম ছিল এবং ফ্রিজে সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, তখন সেই প্রয়োজন মেটাতে ব্র্যাক গ্রামীণ দুগ্ধচাষীদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে দুধ সংগ্রহ করে শহরের বাজারে বিক্রির জন্য দুগ্ধ কারখানা স্থাপন করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্র্যাক তাদের গ্রাহকদের কাছে উচ্চমানের প্যাকেটজাত দুধের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত এবং প্যাকেজযুক্ত দুগ্ধজাত পণ্য সরবরাহ করে আসছে। সারা দেশে ২৮ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত কৃষকদের কাছ থেকে তারা প্রতিদিন ২ লাখ ৫০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে আড়ং ব্র্যান্ডের অধীনে দেশব্যাপী বিক্রি করছে। এছাড়া ব্র্যাক দেশব্যাপী খামারিদের গবাদি পশুর বিকাশ ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, ভ্যাকসিন, ফিড চাষের সুবিধা এবং অন্যান্য সেবা সরবরাহ করে চলছে।

২০০২ সালে ল্যান্ড ও লেকস, টেট্রা প্যাক এবং মার্কিন কৃষি বিভাগের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রাণ কোম্পানি বাংলাদেশের স্কুলগুলোয় পরিচালিত পুষ্টি প্রোগ্রামে অতি উচ্চ তাপমাত্রায় পরিশোধিত ইউএইচটি দুধ বিতরণ শুরু করে। বর্তমানে প্রাণ বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম ডেইরি কোম্পানি পরিচালনা করছে, যা তরল দুধের বাজারের প্রায় ১০ শতাংশ দখল করে আছে।

বর্তমানে মিল্ক ভিটার পাশাপাশি আরো কিছু প্রতিষ্ঠান উন্নত জাতের গরুর ব্যবহার করে দেশে দুধের চাহিদা মিটানোর জন্য কাজ করছে ।সম্প্রতি এরকম একটি প্রাইভেট উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইয়ন গ্রুপের উদ্যোগে দেশে ২২৫ টি উন্নত জাতের গরু দেশে নিয়ে আসে। চট্টগ্রামে নাহার গ্রুপের বিশাল ডেইরী খামারে আছে উন্নত জাতের গাভী, যাদের অনেকগুলোর দৈনিক দুধ উৎপাদন ২০ লিটারের বেশি। এরকম  আরো বেশি কিছু প্রতিষ্ঠান উন্নত জাতের গরু প্রতিপালন করে  শ্বেত বিপল ঘটিয়ে যাচ্ছে নিরবে। তবে দেশে উৎপাদিত দুধের বিরাট একটি অংশ আসে দেশের প্রান্তিক গ্রামীন খামারীদের কাছ থেকে ।তাই তাদের খামারে উৎপাদিত দুধের পরিমান দেশের মোট দুধ উৎপাদনে বিরাট ভূমিকা রাখে।কিন্তু তাদের গরুগুলোর দুধ উৎপাদন কাংখিত নয়। 

বাংলাদেশে যে সমস্ত গরু পাওয়া যায় তা মুলত তিন ধরনের, একটি হল সম্পুর্ন দেশী  জাতের, দ্বিতীয় ধরনটি হল বিদেশী বিভিন্ন জাতের গরু এবং তৃতীয়টি হল সংকর জাতের গরু যা মুলত দেশী এবং বিদেশী জাতের গরুগুলোর আন্তঃ প্রজননের ফলে তৈরি  হয়েছে। বাংলাদেশে যে সমস্ত গরু আছে তার  মধ্যে রয়েছে  লোকাল (L), ফ্রিজিয়ান x লোকাল শংকর (FxL), ফ্রিজিয়ান x শাহিওয়াল শংকর (FxSL), ফ্রিজিয়ান x লোকাল x শাহিওয়াল (FxLxSL) এবং শাহিওয়াল x লোকাল (SL x L)। প্রজননক্ষম গাভী এবং বকনার মধ্যে ২৪% ফ্রিজিয়ান এবং লোকালের শংকর। শংকর জাতের গাভীর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে, বর্তমানে ৫ লিটার থেকে ১২ লিটারে/দৈনিক এ উন্নিত হয়েছে।

দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় পশুর জাত আছে। কিন্তু এসব জাতের গরুর দুধ উৎপাদন এবং জীন গত বৈশিষ্ট্য খুব একটা উন্নত মানের নয়।তাই এই জাতের উন্নয়ন ঘটাতে হলে সংকরায়নের কোন বিকল্প নেই।এই ক্ষেত্রে ভাল জাতের ষাড় নির্বাচন করে “সিলেক্টিভ ব্রিডিং” এর মাধ্যমে জাতের জীন গত উৎকর্ষ সাধন করতে হবে।তবে আমাদের সার্ক ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কৃত্রিম প্রজননের হার পর্যাপ্ত নয়।তার জন্য অবশ্যই পর্যপ্ত কারনও রয়েছে। এখানে খামারীর দোড় গোড়ায় ভাল মানের সীমেন দিয়ে কৃত্রিম প্রজনন সেবা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এখানে সঠিকভাবে প্রজননের জন্য যে কাঠামো গত বৈষিষ্ট্য থাকা দরকার তা নেই। গ্রামীন জনপদে কৃত্রিম প্রজনন বিষয়টি এখনো পর্যন্ত ততটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। উন্নত জাতের গুরুর পুষ্টি সাধনের জন্য যে খাদ্য দরকার তাও এখনো সজলব্য নয় গ্রামীন জনপদে। তাছাড়াও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেক বিষয় জড়িয়ে রয়েছে যা আমাদের দেশীয় কম উৎপাদনশীল গরুর গুলোর জাত উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে।এই কারনে এই অঞ্চলের গরুগুলো উৎপাদন ক্ষমতা কম।কিন্তু দেশের সর্বত্র কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সঠিক ভাবে চালু করা গেলে যেন তেন ভাবে দেশীয় পদ্ধতিতে ষাড়ের ব্যবহারে মাধ্যমে প্রজনন হ্রাস পাবে, হ্রাস পাবে দেশীয় জাতগুলোর মধ্যে আন্তঃপ্রজননের (Inbreeding) এর পরিমানও হ্রাস পাবে। এর ফলে প্রাকৃতিক প্রজননের ফলে যেসব রোগ এক গাভী থেকে অন্য গাভীতে স্থানান্তরিত হয় তার পরিমানও অনেক কমে আসবে। দেশীয় যে সমস্ত গরুর আছে তাদের দেশের আবহাওয়ার সাথে অভিযোজনের ক্ষমতা বেশি তাই সঠিক প্রজনন নীতির মাধ্যমে এদের জীনগত উৎকর্ষ সাধনের ব্যবস্থা করতে হবে। যা দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরনে ব্যপক ভূমিকা রাখবে।

জাত উন্নয়নের কাজটি শুরু হয় ১৯৩৬ সাল থেকেই। সেই সময় দুটি উন্নত মানের হারিয়ান ষাঁড় নিয়ে আসা হয় জাত উন্নয়নের জন্য। এদেরকে মূলত নিয়ে আসা হয় উত্তর ভারত থেকে এবং তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরইয় লর্ড লিনলিথ গো এর মাধ্যমে এই এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর নতুন উদ্যমে জাত উন্নয়নের কাজ শুরু হয়।এই সময় বাইরে থেকে সিন্ধি এবং শাহীওয়ালের ষাঁড় দেশে বিভিন্ন জায়গায় প্রাকৃত্রিক প্রজননের জন্য বিতরন করা হয়  দেশীয় জাতের উন্নয়নের জন্য।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে অষ্ট্রেলিয়া থেকে ফ্রিজিয়ান এবং জার্সি ষাঁড় নিয়ে আসা হয় যা বাংলাদেশর ডেইরী সেক্টরের উন্নয়নে নতুন যুগের সৃষ্টি করে। এর পর থেকে ডেইরী সেক্টরে বিপ্লব শুরু হয়ে যায়,যার ফল শ্রুতিতের বর্তমানে দেশে ১০৬  লক্ষ মেট্রিক টনের উপর দুধ উৎপাদন হচ্ছে। এই উন্নয়নের পেছনে বিরাট ভুমিকা রাখে দেশে সংকর জাতের গরুর পরিমান বৃদ্ধি।তবে দুধে স্বয়ং সম্পূর্নতা অর্জন করতে হলে আমাদেরকে আগাতে হবে আরো বহূদূর।   

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বার্ষিক তরল দুধের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টন। সেখানে দেশীয়ভাবে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১০৬ লাখ টন, যা মোট চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের দৈনিক গড় দুধের চাহিদা রয়েছে ২৫০ মিলিলিটার। এর বিপরীতে পর্যাপ্ততা রয়েছে ১৭৫ মিলিলিটার। তবে মানুষের দুধ গ্রহণের হার ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া আগামী দিনগুলোতে নগরায়ণ ও মানুষের জীবনে ব্যস্ততা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রক্রিয়াজাত দুধের চাহিদা বাড়বে।

সারনীঃ ১ঃ দেশের দুধের উৎপাদন বৃদ্ধির তথ্য চিত্র

উপরের সারনী থেকে দেখা যাচ্ছে যে গত ১০ বছরে দেশের দুধ উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে দুধের উৎপাদন  বৃদ্ধি অব্যহত রাখার জন্য উন্নত জাতের মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনন প্রয়োজন। দেশে সরকারী এবং বেসরকারী পর্যায়ে  গত দশ বছরে কৃত্রিম প্রজননের পরিমান অনেক বৃধি পেয়েছে। ফলে দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক।প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপরোক্ত তথ্য মতে ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশের মোট দুধ উৎপাদন ছিল ২৯.50 লক্ষ মেট্রিক টন যা ২০১৯-২০ অর্থ বছরে প্রায় ৫ গুন বৃদ্ধি পেয়ে হয়ে গেছে ১০৬. ৮০ লক্ষ মেট্রিক টনে পৌঁছে গেছে।যার পিছনে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে উন্নত জাতের গরুর মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনন। এই ক্ষেত্রে, জাতীয় ভাবে কৃত্রিম প্রজননের জন্য যে সমস্ত  ষাড় বাচাই করা হয়েছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু তাদের মায়ের দুধ উৎপাদন ক্ষমতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাই জাতীয়ভাবে প্রজনন কাজে যে সমস্ত ষাড়  ব্যবহার করা হয়েছে তাদের শতকরা ৮০ ভাগই হল ফ্রিজিয়ান আর লোকেলের শংকর।যার ফলে দেশে এই ধরনের জ়ীনের গরুর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।যার ফলশ্রুতিতে গাভী প্রতি  দুধ উৎপাদনে কিছুটা উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং এর  দীর্ঘ স্থায়ী প্রভাব পড়েছে দেশের ডেইরী শিল্পের উপর।এটি সম্ভব হয়েছে শুধু মাত্র গরুর শরীরে দুধ উৎপাদনকারী জ়ীনের সন্নিবেশ ঘটানোর জন্য।আর এই কাজটি কর হয়েছে বিদেশী উন্নত জাতের  গরুর সীমেন দিয়ে দেশীয় গরুর শংকরায়নের ফলে।

আর জীন গত উন্নয়ন  একটি স্থায়ী পরিবর্তন যা বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়।এই জীন গত উন্নয়নের ফলাফল অধিক কার্যকর করতে হলে মাঠ পর্যায়ে গবেষনা করে ভাল বংশধরগুলো মাঠ পর্যায় থেকে সংগ্রহ করে গবেষনাগারে তাদের কর্যক্রম পরীক্ষা করতে হবে।যা করেছিল পার্শবর্তী দেশ ভারত।তারা হলেস্টেইন ফ্রিজিয়ান, হলেস্টেইন ফ্রিজিয়ান শংকর এর পারফর্মেন্স ফিল্ড-বেইসড প্রোজেনী টেস্টিং” এর মাধ্যমে মূল্যায়ন করেন।

একটি গবেষনায় দেখা গেছে ৭৫% HF এবং HxSLxL এর দৈনিক দুধ উৎপাদন ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি।এর পরবর্তীতে আছে  62.5% HF , 50% HF 50% SLxL জাতের সংকর গাভীগুলোর।


চিত্রঃ শংকর জাতের গরুর দুধ উৎপাদনের তথ্য চিত্র
চিত্রঃ জিনোটাইপের উপর ভিত্তি করে গরুর দুধ উৎপাদন ক্ষ্মতার তুলনা মুলক চিত্র

দৈনিক সর্বোচ্চ দুধ উৎপাদনঃ

দৈনিক সর্বোচ্চ দুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সংকর জাতের গাভীর রেকর্ড ভাল এই ক্ষেত্রে ৭৫% HF এর গাভীর পারফরমেন্স সবচেয়ে ভাল।এর পরবর্তীতে আছে H x SL x L সংকর জাতের গাভী। ৬২.৫% HF ,  50% HF এবং 50% SL এর  দৈনিক সর্বোচ্চ দুধ উৎপাদনের রেকর্ড ৭৫% HF এর চেয়ে কম।

চিত্রঃ জিনোটাইপের উপর ভিত্তি করে দৈনিক সর্বোচ্চ দুধ উৎপাদনের তুলনা

দুধ প্রদানের সময়সীমাঃ

গবেষনায় দেখা গেছে ৫০% HF জীনোটাইপের গাভীগুলো দীর্ঘ দীন ধরে দুধ দেয়। তবে ৭৫% HF এর দুধ প্রদানের সময় সীমা ৫০% HF এর কাছাকাছি। সেই তুলনায়  দেশী গরুগুলর দুধ প্রদানের স্থায়ীত্ব অনেক কম।দেশী গরুগুলো বাচ্চা দেওয়ার ২৪০-২৫০ দিনের মধ্যেই দৈনিক দুধ প্রদানের পরিমান প্রায় শূন্যের কোটায় চলে আসে ।অন্যদিনে সংকর জাতের গরুগুলো বাচ্চা দেওয়ার পর ৩০০ দিনের উপরে দুধ দেয়।

ড্রাই প্রিয়ডঃ

ড্রাই প্রিয়ড মানে হল গরু দুধ দেওয়া বন্ধ হওয়ার কতদিন পর পুনরায় দুধ দেওয়া শূরু করে সেই সময়টি।এই ক্ষেত্রে ৭৫% ফ্রিজিয়ান গরুর ড্রাই প্রিয়ড সমচেয়ে কম।কিন্তু দেশী গরুরু ড্রাই প্রিয়ড অনেক বেশি যা ১৪০ দিনের উপরে।

চিত্রঃ বিভিন্ন শংকর জাতের গরুর ড্রাই পিরিয়ডের তুলনা

সারনী -২ থেকে দেখা যায়  ৭৫% ফ্রিজিয়ান সবচেয়ে কম বয়সে ডাকে ফলে সবচেইয়ে কম বয়সে তাদেরকে প্রজনন করানো হয়।যার ফল স্বরুপ সবচেয়ে  ৭৫% ফ্রিজিয়ান গরু সবচেয়ে কম বয়সে তার প্রথম বাচ্চা দেয়।

এতে  সহজে বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের ডেইরী শিল্পের উন্নয়নের জন্য দেশীয় গরুকে উন্নত জাতের গরুর মধ্যমে শংকরায়ন খুব প্রয়োজন। কারন এই পদ্ধতিতেই খুব দ্রুত ভাল ফল পাওয়া যায় এবং খামারী দারুন ভাবে লাভবান হয়।কিন্ত  এ জন্য প্রয়োজন সঠিক জাত নির্বাচন, সঠিক ভারে তথ্য সংরক্ষন করা, সঠিক ট্যাকনিক্যাল সাপোর্ট এবং খামারীদের সঠিক ভাবে প্রশিক্ষিত করা।কারন ভাল দুধ পেতে হলে ভাল জাতের গরু পাশাপাশি খামারের সঠিক ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রন করতে হবে।তাছাড়া পরিবেশের সাথে সহনীয় এবং রোগ বালাই প্রতিরোধ সক্ষম এরকম জাতের গরুর সংখায় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। যার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা গ্রহন এবং তার সুন্দর বাস্তবায়ন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here